শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬, ০৪:১৪ পূর্বাহ্ন
এস এম সাঈদুর রহমান সোহেল ,খুলনা ব্যুরো:
মেঘমুক্ত আকাশ খুলনার আকাশ। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় সুষ্ঠু পরিবেশে ভোট সামগ্রী কেন্দ্রে পৌঁছেছে। ধর-পাকড়ের কারণে ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ ও আতংক বিরাজ করছে দিনভর। উচ্চ আদালতের রীটের পর বিএনপি কর্মীরা স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলে প্রকাশ্যে এসেছেন। আজ প্রত্যাশিত খুলনা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন। মেয়র পদে পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মূল প্রতিদ্বন্দ্বি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। গেল নির্বাচনেও এ দু’ টি দলের প্রার্থীদের মধ্যে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। ২০১৩ সালের ১৫ জুন কেসিসির সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
সপ্তাহকাল ব্যাপী ধরপাকড়ের কারণে ভোটারদের মধ্যে আতংকের সৃস্টি হয়েছে। এ অবস্থা আগে কখনও হয়নি। যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নামধারী ৪শ’ কর্মী পর্যবেক্ষক কার্ড সংগ্রহ করেছে। বিজিবি ও র্যাব নগরীর প্রবেশ দ্বারে পাহারা ও প্রধান সড়কগুলোতে টহল দিচ্ছে।
খুলনা নগরীতে গণগ্রেফতারের প্রতিবাদে হাইকোর্টে করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত খুলনা সিটি করপোরেশন এলাকায় বিএনপির কোনো নেতা-কর্মী, সমর্থককে গ্রেফতার বা হয়রানি না করার নির্দেশ দিয়েছেন উচ্চ আদালত। পুলিশের মহাপরিদর্শক, খুলনার পুলিশ কমিশনার ও পুলিশ সুপারের প্রতি এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিগত কয়েকদিন খুলনায় গণগ্রেপ্তারের পরিপ্রেক্ষিতে রোববার বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান জনস্বার্থে এই রিট করেন। সোমবার শুনানি নিয়ে বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এ আদেশ দেন।
খুলনা সিটি কর্পোরেশনে আসছেন ‘নতুন নগর পিতা’। আজ মঙ্গলবার নগরবাসী ভোটের মাধ্যমে নগর অভিভাবক নির্বাচন করবেন। পাঁচ লাখ ভোটারের দৃস্টি এখন নজরুল ইসলাম মঞ্জু এবং তালুকদার আব্দুল খালেকের দিকে। তবে, চনমনে বিরাজ করছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও আতংক। কি হতে যাচ্ছে, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট হবে কি-না, ভোটাররা নিরাপদে ভোট দিয়ে আবার বাড়ি ফিরতে পারবেন কি-না সে বিষয়েও রয়েছে নানা শংকা।
এদিকে, নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যেই ভোট গ্রহণের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। সোমবার দুপুর থেকে ভোট কেন্দ্রগুলোতে ব্যালট বাক্সসহ নির্বাচনী সরঞ্জাম প্রেরণ শুরু হয়েছে। এর আগে রোববার কেসিসি নির্বাচনের নিরাপত্তায় রোববার সকাল থেকে নগরীতে ১৬ প্লাটুন বর্ডারগার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়। শহরে টহল দিচ্ছে র্যাব-পুলিশ ও গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যরা। পুরো শহর এখন আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে।
নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডের ২৮৯টি ভোট কেন্দ্রের ১ হাজার ৫৬১টি কক্ষে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ৪ লাখ ৯৩ হাজার ৯৩জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এর মধ্যে ২ লাখ ৪৮ হাজার ৯৮৬জন পুরুষ এবং ২ লাখ ৪৪ হাজার ১০৭জন মহিলা ভোটার।
নগরীর ২৪নং ওয়ার্ডের সোনাপোতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ২৭নং ওয়ার্ডের পিটিআই কেন্দ্রে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ করা হবে। মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্যমতে, ২৮৯টির মধ্যে ২৩৪টি কেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ। যদিও বিএনপির দাবি, নগরের শতভাগ কেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ।
নির্বাচনে মেয়র পদে ৫জন, ৩১টি ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১৪৮জন এবং ১০টি সংরক্ষিত আসনে লড়ছেন ৩৯জন নারী প্রার্থী। মেয়র প্রার্থীরা হলেন আওয়ামী লীগ মনোনীত তালুকদার আব্দুল খালেক, বিএনপি মনোনীত নজরুল ইসলাম মঞ্জু, জাতীয় পার্টির এসএম শফিকুর রহমান মুশফিক, ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা মুজ্জাম্মিল হক ও সিপিবি’র মিজানুর রহমান বাবু। তবে, অন্য তিনটি দলের তিন প্রার্থী খুব একটা আলোচনায় নেই। মূলত আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির প্রার্থীর মধ্যেই হচ্ছে কেসিসি মেয়র পদের মূল লড়াই।
মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু’র প্রেস ব্রিফিং :
বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু অভিযোগ করেছেন, সরকার কেসিসিতে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ করছে। পুলিশের নেতৃত্বে রাতেই ব্যালট পেপারে সীল মেরে বাক্স ভরার ষড়যন্ত্র চলছে। একই সঙ্গে পুলিশ বিএনপির ভোট ব্যাংক এলাকায় ব্লক রেইড’র নামে হিংস্র রূপে হানা দেওয়ারও পরিকল্পনা করেছে। সরকারের মন্ত্রী পরিষদ এবং এমপি-মন্ত্রীসহ সিনিয়র নেতারাও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তার মতো (মঞ্জু) একজন রাজপথের কর্মীকে খোদ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেই লড়াই করতে হচ্ছে।
সোমবার বেলা সাড়ে ১১ টায় দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে নজরুল ইসলাম মঞ্জু এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ বহিরাগতদের এনে শহরের হোটেল, রেস্ট হাউজ ও আবাসিক কোয়াটারসহ বিভিন্ন এলাকায় ভাগ ভাগ করে রেখেছে। এমনকি পুলিশের নামেও বিভিন্ন হোটেল বুকিং দেওয়া হয়েছে। ভোটের দিন এসব বহিরাগতরা বিভিন্ন ভোট কেন্দ্রে ঢুকে নিজেরা নিজেরা সংঘর্ষে লিপ্ত হবে। এরপর ভয়ে ভোটাররা কেন্দ্র ত্যাগ করলে তারা ব্যালট কেটে বাক্সে ঢুকাবে। এভাবে নানা ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতা চালিয়ে সরকার জনতার বিজয় ছিনিয়ে নিতে চায়। এ অপতৎপরতা রূখে দিতে তিনি জনগণকে সাহসি ভূমিকা পালনের আহবান জানান। নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, সরকার এবং নির্বাচন কমিশন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে পারে কি-না- এটি দেখতেই বিএনপি কেসিসি নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। একই সঙ্গে দলীয় চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কারামুক্তি এবং জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার আন্দোলনের অংশ হিসেবেই বিএনপি মাঠে রয়েছে। কিন্তু বিগত সাড়ে ৯ বছরে প্রমাণিত হয়েছে বর্তমান সরকারের অধীনে কোন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। যার সর্বশেষ আঘাত সরকার এবং পুলিশের দানবীয় ও ড্রাকুলার হিংস্র চেহারায় প্রতিফলিত হয়েছে।
তিনি পুলিশের হিংস্র ভূমিকায় ধিক্কার জানিয়ে বলেন, পুলিশ এ পর্যন্ত বিএনপির ১৩৭জন এবং শরীকদলের ১০জন নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করেছে। তবে, দলের সদস্য বাদে সমর্থকসহ এ সংখ্যা আড়াই শতাধিক। পুলিশ গ্রেফতার বাণিজ্য করেছে। দলের একজন অসুস্থ্য নেতাকে হাতকড়া পরিয়ে আবার ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দিয়েছে। এমনকি তার (মঞ্জুর) পরিবারও পুলিশের হিংস্রতা থেকে রেহাই পায়নি। এসআই অচিন্ত ও বিপ্লবের নেতৃত্বে তিন গাড়ী পুলিশ তার বাড়িতে গিয়ে স্ত্রী, ভাই-বোন ও স্বজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও ভয়ভীতি দেখিয়েছে। তার ভাই কারণ জানতে চাইলে হুংকার দিয়ে পুলিশ বলেছে, ‘কথা বললেই কল্লা ছিড়ে ফেলবো’। তিনি এ ধরণের আচরণের তীব্র নিন্দা ও ঘৃণা প্রকাশ করে প্রশ্ন রাখেন- আওয়ামী লীগ একটি সিটি নির্বাচন করায়ত্ব করতে কোথায় যাচ্ছে? যে কোন মূল্যে সরকারকে বিজয়ী হতেই হবে? আওয়ামী লীগের হিং¯্র চেহারা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতেই বিএনপি নির্বাচনের মাঠে থাকবে বলেও দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। নজরুল ইসলাম মঞ্জু অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ শহরে বিপুল অংকের কালো টাকা ছড়িয়েছে। বিশেষ করে বস্তি ও চর এলাকায় তারা ভোট কেনার চেষ্টা করছে। এভাবে একটি নির্বাচনকে পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা করছে তারা। রোববার তাকে খালিশপুরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও অস্ত্রধারীরা মিছিল করেছে। নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, আওয়ামী লীগের সাথে আছে পুলিশ, পেশীশক্তি আর কালো টাকা। আর বিএনপির সঙ্গে রয়েছে জনগন। নাগরিক শাসন, সুশাসন, ভোটের অধিকার এবং সুন্দর শহর গড়তে তিনি ভোটারদের মঙ্গলবার সকালেই ভোট কেন্দ্রে গিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে এ নির্বাচনে অংশ গ্রহণের আহবান জানান।